গণতন্ত্র বিকাশে চাই নিরপেক্ষ গণমাধ্যম

08 October 2026, 02:09 AM
গণতন্ত্র বিকাশে চাই নিরপেক্ষ গণমাধ্যম

 ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী: গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের শাসন, অর্থাৎ যে সরকারব্যবস্থায় জনমতের প্রাধান্য থাকে এবং জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালিত হয়। গণতন্ত্র দুই ধরনের। এক. প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র : যে ব্যবস্থায় জনগণ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।  দুই. পরোক্ষ গণতন্ত্র : যে ব্যবস্থায় জনগণের প্রতিনিধির মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালিত হয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর এক ঐতিহাসিক ভাষণে গণতন্ত্রের জগৎখ্যাত এক সংজ্ঞা দিয়েছিলেন যার মর্মার্থ হলো-সত্যিকার গণতান্ত্রিকব্যবস্থায় সরকার হবে জনগণের। সরকার গঠিত হবে জনগণের দ্বারা এবং সরকার হবে জনগণের কল্যাণের জন্য। গণতন্ত্রের এই মর্মবাণী সমাদৃত হয়েছে যুগে যুগে, দেশে দেশে। বস্তুত এটাই পশ্চিমা গণতন্ত্রের আদর্শ রূপ। পশ্চিমা গণতন্ত্রের আদলেই বর্তমান সময়ে প্রাচ্য সমাজেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চলছে।


গণতন্ত্র শাব্দিক অর্থে রাষ্ট্রনীতি বা রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তবে এ শুধু রাজনীতির বিষয় নয়। সমাজ ও সমাজ কাঠামোর মৌল উপাদানসমূহের অন্যতম হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতির মূল মর্মবাণী সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপন করা। গণতন্ত্র শুধু রাষ্ট্রনীতি কিংবা রাজনীতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। এটা সমাজের সব পর্যায়ে, সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়, তা হচ্ছে-জনগণের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের বিষয় দুটি সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। বৃহত্তর সমাজ বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ব্যক্তি। রাষ্ট্রের যেকোনো সিদ্ধান্তে ব্যক্তি অথবা তার প্রতিনিধির অংশগ্রহণ অতি আবশ্যক। আর তা সম্ভব ব্যক্তিকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলার মাধ্যমে। কেননা শিক্ষিত ব্যক্তিমাত্রই তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন। সামাজিক ও নাগরিক অধিকারের আইনগত দিকগুলো তাঁর পক্ষেই জানা সম্ভব। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের প্রতি আমরা যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যাবে তাদের গণমাধ্যম জনগণকে রাজনৈতিক ও অন্যান্য বিষয়ে সচেতন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাস্তবিকপক্ষে গণমাধ্যমই মানুষের মাঝে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারে। সংবাদমাধ্যমই পারে কোনো জাতির চরিত্র বদলাতে। এর অনেক নজির আছে।


একজন মার্কিন সমাজতত্ত্ববিদের মতে, গণতন্ত্র হবে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা সরকার ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে পরিবর্তনের নিয়মিত সাংবিধানিক সুযোগ দান করে। গণতন্ত্র বিষয়টি চর্চার ব্যাপার। এটা বলা যত সহজ, বাস্তবায়ন তার চেয়ে অনেক কঠিন। ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত ভারতবর্ষে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। পরবর্তীতে এক সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হয়, সেখানেও একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম, বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ ইত্যাদির ফলে গোটা সমাজে দেখা দেয় অস্থিরতা ও নৈরাজ্য। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের আমলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। 


১৯৯০ সালে গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার ক্ষেত্রে তেমন কোনো তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। উল্লেখ্য, গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক সংসদ। আরও রয়েছে অনেকগুলো প্রতীক, যেমন আইনের যথাযথ প্রয়োগ, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নির্বাচিত স্থানীয় সংগঠনসমূহের অংশগ্রহণ ইত্যাদি। এগুলোই হচ্ছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের যথাযথ চর্চার প্রতিফলন। যে সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে, সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়, সব নাগরিক তার অধিকার ভোগ করার যথাযথ সুযোগ পায়। স্থানীয় ও উচ্চপর্যায়ের সব সংগঠনে তার মতামতের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় এবং গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ পায়। এ ধরনের রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের যথাযথ চর্চা হচ্ছে বলে ধরে নেওয়া যায়। স্বাধীন গণমাধ্যমকে একটি দেশের বিকল্প সংসদ বলা যায়। যে দেশের গণমাধ্যম যত শক্তিশালী ও স্বাধীন সে দেশের গণতন্ত্র তত বেশি শক্তিশালী ও টেকসই। দেশের প্রশাসনিক বিষয় সম্পর্কে গণমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত জনগণকে অবহিত করে। জনমত সৃষ্টি, জনমত সমন্বয় আর জনসংযোগের উপায় হিসেবে গণমাধ্যম সহায়ক শক্তি রূপে কাজ করে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সহজে পরিচয় ঘটে গণমাধ্যমের মাধ্যমে। রাজনৈতিক সচেতনতা ও জাতীয় জীবনে সংহতি সৃষ্টিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। জাতীয় জীবনের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি স্বাধীন গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। ঘটনাপ্রবাহের বিশ্লেষণ, গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা, মানবিক সম্পর্কোন্নয়নে অনুষ্ঠানাদি থেকে জাতি গঠনের প্রেরণা লাভ করা যায়।


স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এবং পরবর্তীতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি দেশের গণমাধ্যম ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক সংবাদ, টকশো ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রকাশ ও প্রচার করে গণমাধ্যমগুলো জনমত গঠনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


গণতন্ত্রের বিকাশ বা সাফল্য কতগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। জনগণের গণতান্ত্রিক ধারণা, ভ্রাতৃত্ববোধ, সুশিক্ষা অধিকার সচেতনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও নৈতিকতাবোধ, সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল, সহিষ্ণুতা, জনমতের গুরুত্ব ইত্যাদি। যেকোনো দেশ বা সমাজে গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শক্তি হচ্ছে স্বাধীন গণমাধ্যম।


চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান সংঘটনে দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমের (ইলেকট্র্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া) ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক। ছাত্র-জনতার এই রক্তস্নাত আন্দোলন ও গণ অভ্যুত্থানকে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলোর অবদান অনস্বীকার্য।


বর্তমানে দেশে অনেক দৈনিক, সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। এ ছাড়াও বেশ কিছু টিভি চ্যানেল ও এফএম রেডিও এসেছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক। ১৯৯১ সালে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংবাদপত্রগুলো অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করেছে। স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকে না। বস্তুতপক্ষে গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। পৃথিবীর সব সভ্য সমাজে আমরা এ ব্যবস্থা দেখতে পাই। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করেছে মৌলিক অধিকার তথা মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার।


আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, ওবামার বিজয়ের পেছনে গণমাধ্যম বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। কারণ সেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ জনমতের তোয়াক্কা না করে দেশে দেশে যুদ্ধ সম্প্রসারিত করেছিলেন। তাঁর গৃহীত বিভিন্ন নীতির কারণে জনগণের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যাহত হচ্ছিল, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। সে কারণেই ওবামার প্রস্তাবিত বিভিন্ন পরিকল্পনা সে দেশের গণমাধ্যম ফলাও করে প্রচার করে, যা ওবামার অনুকূলে জনমত গঠনে বিরাট ভূমিকা রাখে। এতে ওবামার বিজয় এবং গণতন্ত্রের যাত্রাপথ সুগম হয়।


অন্যদিকে এর বিপরীত চিত্রও আছে। গণমাধ্যম যদি নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে, তাহলে গণতন্ত্রের যাত্রাপথ ভঙ্গুর হতে পারে। সংবাদ যদি হয় বস্তুনিষ্ঠ, তাহলেই সংবাদপত্র হবে নিরপেক্ষ। আর যদি সংবাদ হয় বিকৃত, মিথ্যা, বানোয়াট এবং মনগড়া; তাহলে সেই সংবাদপত্র হবে পক্ষপাতদুষ্ট। আজ যে রাজনীতি দেশকে বিভক্ত করেছে, তেমনি বিভক্ত করেছে সংবাদপত্রগুলোকেও। সাংবাদিকের ওপরই মূলত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নির্ভর করে। সাংবাদিক যদি সৎ, বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যসন্ধানী হন, তাহলেই সংবাদপত্র নিরপেক্ষ হবে। আর সাংবাদিক যদি হন অসৎ, মিথ্যাবাদী ও স্বার্থপর, তাহলে সংবাদপত্র হবে পক্ষপাতদুষ্ট।


অসত্য সংবাদ পরিবেশন করে হয়তো তাৎক্ষণিক ভালো ফল পাওয়া যায়, কিন্তু তা কখনো দীর্ঘস্থায়ী ফল বয়ে আনে না। বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ শেষ বিচারে গণমাধ্যমের ক্ষতিই করে এবং দেশ, জাতি, সমাজ ও রাষ্ট্র তথা গণতন্ত্রের বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।


গণতন্ত্রের যাত্রাপথে গণমাধ্যম চিরকাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০২৬ সালে দেশে এক অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে শুভ সূচনা হয়েছে, তার চর্চা ও অনুশীলন অব্যাহত থাকলে গণতন্ত্র এখানে অচিরেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে। তবে এ ধারা টিকিয়ে রাখতে হলে সব রাজনৈতিক দলকে আন্তরিক হতে হবে। সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ ত্যাগ করে জাতীয় স্বার্থকে বড় করে দেখতে হবে; জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং গণমাধ্যমকে যথাযথ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।


♦ লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক রাষ্ট্রদূত। প্রফেসর ইমেরিটাস, ঢাবি