শেখ হাসিনার দেশে ফেরার রোডম্যাপ!
নিউজ ডেস্ক: আমি দীর্ঘদিন বেঁচেছি। এখন দেশের মানুষের জন্য মরতে প্রস্তুত। তারা যদি আমাকে ফাঁসিও দেয় আমি দেশের মানুষের জন্য আমার জীবন উৎসর্গ করব। বাংলাদেশে ফেরার ব্যাপারে এভাবেই নিজের দৃঢ় সংকল্পের কথা পুনর্ব্যক্ত করলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জানান দেশে ফেরার রোডম্যাপ ঘোষণা করবেন। কথা বললেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও। এর আগে দিল্লিতে দুটি প্রেস কনফারেন্সে কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। এবার লন্ডনে এক সেমিনারে কথা বললেন। মঙ্গলবার লন্ডনের এই সেমিনারে ছিলেন ব্রিটেনের একজন সংসদ সদস্য এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একজন সাবেক এমপি।
শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, বাংলাদেশের সিনিয়র সাংবাদিক সৈয়দ বদরুল আহসান সহ আরো বেশ কয়েকজন সেখানে কথা বলেন। তবে সব আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল তার ফেরা নিয়েই। একজন সাংবাদিক জানতে চান দেশে ফিরলে ফাঁসির ঝুঁকি আছে। তাহলে তিনি ফিরবেন কিভাবে? শেখ হাসিনা সরাসরি উত্তর দেন, আমি দীর্ঘ জীবন পেয়েছি, দীর্ঘদিন বেঁচেছি। এখন দেশের মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে চাই। অর্থাৎ ফাঁসির ঝুঁকি সত্ত্বেও দেশে ফিরবেন তিনি। এই পর্যায়ে একজন জানতে চান সেই ফেরাটা কবে এবং কিভাবে হবে? শেখ হাসিনা এই প্রশ্নের যে উত্তর দেন তা অবশ্য সবারই জানা। তিনি জানান, তার পাসপোর্ট নেই। সরকার তার পাসপোর্ট বাতিল করেছে।
পাসপোর্ট নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে তা কোন প্রক্রিয়ায় হবে সে বিষয়ে তিনি পরে জানাবেন। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের আশ্রয়ে আছেন। শেখ হাসিনা নিজে যদি তার আশ্রিত স্ট্যাটাস বাতিল করার আবেদন করেন তাহলে ভারত সরকার তার আশ্রিত স্ট্যাটাস বাতিল করতে পারে। একমাত্র তখনই তিনি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারবেন। ইউনুস সরকার শেখ হাসিনা সহ ৯৭ জনের পাসপোর্ট বাতিল করেছে। তবে জটিলতাটা হলো যে মুহূর্তে ভারত তার রাজনৈতিক আশ্রয় বাতিল করবে সেই মুহূর্তে বন্দি বিনিময় চুক্তি অক্টিভেট হয়ে যাবে। ফলে তখন তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত দিতে ভারত বাধ্য। পাসপোর্ট পেলেও ভারত সরকারকে তখন বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করতে হবে।
এটা হতে পারে বাংলাদেশ থেকে কোন প্রতিনিধি গিয়ে তাকে দিল্লিতে গ্রহণ করে বিমানে করে ঢাকায় ফিরিয়ে আনলেন অথবা বিএসএফ এর মাধ্যমে তাকে সীমান্তে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হলো। অনেকে বলছেন শেখ হাসিনা যেহেতু বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাননি তাই তার উপর বন্দি বিনিময় চুক্তি কার্যকর হবে না। কিন্তু আইনটি এমন নয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে যাওয়ার আগে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে কথা হয়। তাদের গ্রীন সিগনাল পেয়েই শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি ভারতের মাটিতে নামে। ভারতীয় কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে রিসিভও করেন। কিন্তু যাওয়ার আগেই কিছু অপরাধ করে গেছেন তিনি। এর মধ্যে পূর্বাচলে প্লট দুর্নীতি থেকে জুলাই আন্দোলনে ছাত্র হত্যা পর্যন্ত অনেক অভিযোগই আছে।
এই অভিযোগের কয়েকটি মামলার রায়ও হয়েছে। ফলে আইনের দৃষ্টিতে তিনি পলাতক। আইনের দৃষ্টিতে তিনি যেহেতু পলাতক তাই তাকে ফিরিয়ে আনার আইনও প্রযোজ্য। শেখ হাসিনা নিজে বিষয়টি জানেন। কারণ চুক্তিটি তিনিই করেছিলেন। এজন্যই তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরার কথা বলছেন। অর্থাৎ ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরাটা হবে দুই দেশের বন্দি বিনিময় চুক্তি অনুসারে। ভারতের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে শেখ হাসিনাকে তুলে দেবে। তবে মঙ্গলবারের বৈঠকে শেখ হাসিনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বার্তা ছিল সশস্ত্র বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি। শেখ হাসিনা বলেন, সশস্ত্র বাহিনী এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষের সেবা করা। যারা সাময়িকভাবে ক্ষমতায় আছে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজ করা তাদের দায়িত্ব নয়।
যদি তারা তেমনটা করেন তাহলে জনগণ তা মনে রাখবে। জনগণ তাদের কথা মনে রাখবে বলার মাধ্যমে শেখ হাসিনা কি প্রচ্ছন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন? তিনি বা তার দল কখনো ক্ষমতায় গেলে সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীতে আবার দলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবেন। শেখ হাসিনা একই সাথে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আবেদন রাখেন বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুর অধিকার। এই বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের মানুষের অবস্থানের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশের সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালনায় কাকে বেছে নেবে? এটা বাংলাদেশের মানুষের অধিকার। কাজেই এই বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপ তিনি মেনে নেবেন না।
সেমিনারে শেখ হাসিনার অবস্থান ও বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি গোছানো এবং সংহত অবস্থানে আছেন। মাত্র ১৫ মিনিটের বক্তৃতায় তিনি তার অবস্থান তুলে ধরেন। লন্ডনের সেমিনারে শেখ হাসিনার বক্তব্য তার রাজনৈতিক কৌশল এবং ভবিষ্যৎ অবস্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। আইনি জটিলতা, বাতিলকৃত পাসপোর্ট এবং ভারত-বাংলাদেশের বন্দি বিনিময় চুক্তির কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি দেশে ফেরার উপরে জোর দিচ্ছেন। একদিক থেকে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং ফাঁসির ঝুঁকি সামলে আত্মত্যাগের ভাবমূর্তি তৈরি করতে চাইছেন। অন্যদিকে সশস্ত্র বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সংহতি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন।
তবে এই ফেরা এবং পুনর্গঠন কতটা সফল হবে তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে ভারত বাংলাদেশের কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত বন্দী বিনিময় চুক্তির প্রয়োগ এবং দেশের সাধারণ জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার উপরে ডিসেম্বর আসতে আর দুই মাস বাকি তবে এরই মধ্যে ডিসেম্বর নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে দেশের মধ্যেই জামায়াত এবং এনসিপির মত রাজনৈতিক দলগুলো সরকারবিরোধী আন্দোলন করছে ওদিকে শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগও সক্রিয়। তবে শেষ পর্যন্ত ঘুরে ফিরে একই প্রশ্ন বারবার আসছে।
কিভাবে? শেখ হাসিনা নিজেও বলেছেন, রোডম্যাপ খুব শীঘ্রই জানাবেন। তবে সেটা কি হবে তা মোটামুটি অনুমান করা যায়। কিন্তু শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে খুবই আনপ্রেডিক্টেবল। নিজে সরাসরি রাজনীতি করছেন ৫০ বছর ধরে। আর পারিবারিক রাজনীতির ঐতিহ্য তার জন্মের আগে থেকেই। কাজেই শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত কি পদক্ষেপ নেবেন? তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না।